চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডের বেডে শুয়ে তখনও অপারেশনের ব্যথা সহ্য করছেন শাহনাজ বেগম শেলী। সিজারিয়ান অপারেশনের ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি। পাশের ঘরে তার সদ্যোজাত কন্যাশিশু চিকিৎসাধীন। অথচ জীবনের এই সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে পাশে থাকার কথা ছিল যার,সেই স্বামী বেলাল আহমেদ আর নেই। হাসপাতালের গেট পেরিয়ে তিনি উধাও হয়ে গেছেন। কারণ, তার ঘরে জন্ম নিয়েছে একটি মেয়ে সন্তান।পরিবার ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বিয়ের পর থেকেই বেলাল আহমেদ বারবার স্ত্রী শাহনাজকে বলতেন, ছেলে সন্তান না হলে তিনি সংসার করবেন না। বিষয়টি নিয়ে প্রায়ই দাম্পত্য জীবনে অশান্তি লেগে থাকত। এরপর গত ১৬ এপ্রিল হঠাৎ প্রসববেদনা উঠলে শাহনাজ বেগমকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। সে সময়ও স্বামীর পক্ষ থেকে তেমন সহযোগিতা পাননি তিনি।চিকিৎসকরা জানান, প্রসবকালীন জটিলতা দেখা দেওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে শাহনাজ বেগমের সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়। অপারেশনের পরপরই নবজাতক কন্যাশিশুর কান্না শোনা যায়। কিন্তু সেই সময়েই স্বামী বেলাল আহমেদ হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। হাসপাতালের কর্মীরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে আর খুঁজে পাননি।এদিকে সন্তানের জন্মের কয়েকদিন পর নতুন আরেকটি দুশ্চিন্তা দেখা দেয়। গত ২০ এপ্রিল নবজাতকের শরীরে জন্ডিস ধরা পড়ে। দ্রুত তাকে হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ)-তে নেওয়া হয় এবং ফোটোথেরাপি শুরু করা হয়। যন্ত্রের বিশেষ আলোর নিচে চিকিৎসা নিতে থাকে ছোট্ট শিশুটি। অন্যদিকে সিজারিয়ান অপারেশনের ধকল সামলে উঠতে না পারা অসুস্থ মা হাসপাতালের বেডে শুয়ে উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে থাকেন।
মা ও শিশুর এই অসহায় পরিস্থিতির খবর ধীরে ধীরে হাসপাতালের ভেতর থেকে বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি পৌঁছে যায় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার কাছেও। খবর পাওয়ার পর তিনি বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন এবং কোনো দেরি না করে সরাসরি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান।হাসপাতালে গিয়ে জেলা প্রশাসক প্রথমে অসুস্থ মা শাহনাজ বেগমের খোঁজখবর নেন এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে মা ও শিশুর শারীরিক অবস্থার বিস্তারিত জানতে চান। এরপর নবজাতক শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় খাবার, পোশাক, ডায়াপারসহ বিভিন্ন সামগ্রী প্রদান করেন। একই সঙ্গে অসুস্থ মায়ের জন্য নতুন পোশাক এবং এক মাসের প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী তুলে দেন। মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে তিনি নগদ অর্থও প্রদান করেন, যাতে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর মা ও শিশুর প্রাথমিক প্রয়োজনগুলো মেটানো যায়।শুধু তা-ই নয়, হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার আগে জেলা প্রশাসক সেখানে কর্মরত একজন দায়িত্বশীল কর্মচারীকে মা ও শিশুর নিয়মিত খোঁজখবর রাখার নির্দেশ দেন। প্রয়োজনে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও সহায়তা দেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।এ সময় আবেগাপ্লুত হয়ে শাহনাজ বেগম বলেন, “আমি একেবারেই অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। স্বামী আমাকে এই অবস্থায় ফেলে চলে গেছে। ডিসি স্যার এসে পাশে দাঁড়িয়েছেন, সাহায্য করেছেন। তিনি না থাকলে কী যে হতো, আমি জানি না।”চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নবজাতক শিশুটির জন্ডিস অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং চিকিৎসায় ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে। ফোটোথেরাপির চিকিৎসা শেষ হলে শিগগিরই শিশুটিকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।এই ঘটনার পর হাসপাতালজুড়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, মেয়ে সন্তান হওয়াকে কেন্দ্র করে এখনো সমাজের একটি অংশে যে কুসংস্কার ও বৈষম্য বিদ্যমান, এই ঘটনাটি তারই একটি নির্মম উদাহরণ। তবে একই সঙ্গে জেলা প্রশাসকের মানবিক উদ্যোগ অনেকের হৃদয় ছুঁয়েছে।স্বামী পরিত্যক্ত হলেও নবজাতক এই কন্যাশিশুটি একা নয়। মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং সমাজের সহানুভূতির হাত তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এখন সবার প্রত্যাশা,মা ও শিশুর নতুন জীবনের পথটি হোক নিরাপদ ও আলোকিত। জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম