আবু নাঈম,বোয়ালখালী:
দরজার দিকে মাঝেমধ্যেই তাকাচ্ছে পাঁচ বছরের জান্নাতুল মাওয়া আফরা। ঘরে অনেক মানুষের আনাগোনা। কেউ কথা বলছেন নিচু স্বরে, কেউ চোখ মুছছেন। মায়ের কোলে বসে থাকা ছোট্ট মেয়েটি হয়তো এখনো বুঝতে পারেনি, যে মানুষটির জন্য সে অপেক্ষা করছে, সেই বাবা আর কোনো দিন ফিরবেন না।
আফরার বাবা দিদারুল আলম (৩২)। চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পশ্চিম গোমদণ্ডীতে কনফিডেন্স সল্ট লিমিটেড কারখানায় আগুন ও বিস্ফোরণে দগ্ধ হওয়া ১১ শ্রমিকের একজন ছিলেন তিনি। শরীরের প্রায় ৯৫ শতাংশ দগ্ধ হওয়ার পর বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
দিদারুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকে স্তব্ধ পুরো পরিবার। ঘরের সামনে মায়ের কোলে বসে আছে আফরা। কখনো মায়ের মুখের দিকে, কখনো দরজার দিকে তাকাচ্ছে। কয়েক দিন আগেও যে বাবা প্রতিদিন তাকে স্কুলে নিয়ে যেতেন, সেই মানুষটি আর ফিরবেন না—এ কথা সে এখনো জানে না।
আফরার মা শারমিন আক্তার বলেন, বৃহস্পতিবার মেয়ের পরীক্ষা ছিল। তাই স্বামী বলেছিলেন, একটু দেরি করে কাজে যাবেন। সকাল সাড়ে আটটার দিকে তিনি মেয়েকে নিয়ে স্কুলে বের হওয়ার সময় দিদারুল বলেছিলেন, ‘তুমি যাও, মেয়ের পরীক্ষা শেষ করে আসো। আমি বাসায় আছি।’ সেটিই ছিল তাঁদের শেষ স্বাভাবিক কথা।
স্কুলে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পর একটি ফোন আসে। কারখানায় বিস্ফোরণের খবর জানিয়ে জানতে চাওয়া হয়, দিদারুল সেখানে ছিলেন কি না।
শারমিন বলেন, ‘আমি তখনও জানতাম, উনি বাসায় আছেন। পরে জানতে পারি, উনি কারখানায় গিয়েছিলেন। বিস্ফোরণের সময় সামনেই ছিলেন।’
খবর পেয়ে মেয়েকে নিয়েই তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ছুটে যান। সেখানে চিকিৎসকেরা জানান, দিদারুলের শরীরের প্রায় ৯৫ শতাংশ পুড়ে গেছে।
শারমিন বলেন, ‘শেষবার শুধু বলেছিল, “আমাকে মাফ করে দিও। আমার মেয়েটাকে দেখে রেখো।” তখন বুঝিনি, এটাই ওর শেষ কথা।’ এই কথা বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
ছয় বছরের সংসারে আফরাই তাঁদের একমাত্র সন্তান। দিদারুল ছিলেন চার বোনের একমাত্র ভাই। মা আগেই মারা গেছেন। অসুস্থ বৃদ্ধ বাবাসহ পরিবারের দায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে। তিনিই ছিলেন পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী।
শারমিন বলেন, ‘আমার মেয়ে এখনো বাবাকে খুঁজে। আমি জানি না, ওকে কীভাবে বলব, তার বাবা আর ফিরবে না।’
পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বদন আলীর বাড়িতে এখন শুধু শোকের নীরবতা। সেই নীরবতার মধ্যেও ছোট্ট আফরার অপেক্ষা থেমে নেই। হয়তো সে এখনো বিশ্বাস করে, দরজাটা খুলে একসময় বাবা ঘরে ঢুকবেন। কিন্তু পরিবারের সবাই জানেন, সেই অপেক্ষার আর কোনো শেষ নেই।