বোয়ালখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি:
এক হাতে ত্রিশূল, অন্য হাতে বিচারকের গ্যাভেল। বিচারকের আসনে দেবী দুর্গা। পাশে আইনজীবীর আদলে গণেশ, সরস্বতী, লক্ষ্মী ও কার্তিক। কাঠগড়ায় মানুষরূপী আসামি। আর সাক্ষীর চোখ বাঁধা, কানে তুলো। মণ্ডপের দেয়ালে দেয়ালে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নারীর প্রতি নির্যাতন, নিপীড়ন, সামাজিক বৈষম্য ও বিচারহীনতার চিত্র।
ধর্মীয় উৎসবের আবহে এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন করা হয়েছে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম পোপাদিয়া শ্রীশ্রী ভুবনেশ্বরী সার্বজনীন মাতৃমন্দিরে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে ‘মাতৃ আদালত’ নামে এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে নারীর প্রতি অন্যায়-অবিচার এবং এসব ঘটনায় সমাজের নীরব থাকার প্রবণতা তুলে ধরেছেন আয়োজকরা।
মণ্ডপে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে আদালতের আদলে সাজানো মঞ্চ। সেখানে বিচারকের আসনে দেবী দুর্গাকে উপস্থাপন করা হয়েছে ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে। পৌরাণিক কাহিনির পাশাপাশি বর্তমান সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নিপীড়নের নানা চিত্র তুলে ধরা হয়েছে মণ্ডপের বিভিন্ন অংশে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস ও পৌরাণিক বর্ণনায় দেবী দুর্গার দশ হাতে থাকা বিভিন্ন অস্ত্র শক্তি, সাহস এবং অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক। তবে ‘মাতৃ আদালত’ আয়োজনের মাধ্যমে দেবী দুর্গাকে শক্তির প্রতীকের পাশাপাশি ন্যায়বিচারের আসনেও উপস্থাপন করা হয়েছে।
মণ্ডপের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে নারীর প্রতি নির্যাতনের প্রতীকী উপস্থাপনা। মহাভারতের দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ ও রামায়ণের সীতা হরণের মতো পৌরাণিক ঘটনার পাশাপাশি তুলে ধরা হয়েছে সমকালীন সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নিপীড়নের চিত্র। কোথাও নির্যাতনের শিকার নারীর অসহায়ত্ব, কোথাও প্রতিবাদ ও আত্মরক্ষার প্রয়োজনীয়তা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
মন্দিরের স্থায়ী কমিটির কোষাধ্যক্ষ এবং ‘মাতৃ আদালত’-এর পরিকল্পনা ও সাজসজ্জার সঙ্গে যুক্ত জেকি ঘোষ মুন্না বলেন, যুগে যুগে নারীদের ওপর ঘটে যাওয়া নির্যাতন, নিপীড়ন ও অবিচারের চিত্র তুলে ধরতেই এবারের আয়োজন।
তিনি বলেন, ‘আমরা বিচার মায়ের হাতে তুলে দিয়েছি। কাঠগড়ায় মানুষরূপী আসামিদের দাঁড় করিয়েছি। আমাদের সাক্ষীর চোখ বন্ধ, কানে তুলো। এর মধ্য দিয়ে বর্তমান সমাজের একটি চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। সমাজে কত কিছু ঘটে, অথচ অনেক সময় সেসব দেখেও দেখা হয় না, শুনেও শোনা হয় না।’
জেকি ঘোষ মুন্না আরও বলেন, ‘আমরা চাই, নারী-পুরুষ সবাই এই ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হোক। শুধু ধর্মীয় কাহিনি নয়, যুগে যুগে নারীদের ওপর যে অন্যায় হয়েছে, তা নিয়ে মানুষ ভাবুক। সত্যযুগ, ত্রেতাযুগ, দ্বাপরযুগ পেরিয়ে কলিযুগেও নারীর প্রতি নানা অন্যায়-অবিচার চলছে। এসব বিষয় একসঙ্গে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।’
আয়োজকরা জানান, দুর্গাপূজার মণ্ডপে সাধারণত পৌরাণিক কাহিনি ও ধর্মীয় বিষয় প্রাধান্য পায়। তবে এবার সেই ধারার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে সামাজিক সচেতনতার বার্তা। দর্শনার্থীরা যেন মণ্ডপ ঘুরে দেখার পাশাপাশি নারীর অধিকার, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিয়েও ভাবেন, সেটিই তাঁদের উদ্দেশ্য।
মন্দিরের স্থায়ী কমিটির সভাপতি জুয়েল দাশ বলেন, সারা বছর অপেক্ষার পর মহালয়া থেকে তাঁদের শারদীয় উৎসব শুরু হয়েছে। এবার আয়োজনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘মাতৃ আদালত’। বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে এ আয়োজন দর্শনার্থীদের ভালো লাগবে বলে আশা করছেন তাঁরা।
তিনি জানান, ২০০৮ সাল থেকে পশ্চিম পোপাদিয়া শ্রীশ্রী ভুবনেশ্বরী সার্বজনীন মাতৃমন্দিরে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ বছর মন্দিরটির পূজা আয়োজনের ১৮ বছর পূর্ণ হয়েছে।
ব্যতিক্রমী এ আয়োজন দেখতে এসে ভালো লাগার কথা জানিয়েছে শিশু দর্শনার্থী রুবেশ দাশ। সে বলে, ‘এই মাতৃ আদালতে বিভিন্ন ধরনের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এখানে এসে মা দুর্গাকে দেখে আমার খুব ভালো লাগছে। এখানে অনেক কিছু শেখার আছে। আমি এসে অনেক খুশি হয়েছি।’
পোপাদিয়া গ্রামের দর্শনার্থী অয়ন মল্লিক বলেন, বোয়ালখালীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে এ মণ্ডপে এসে নারীর প্রতি নির্যাতন ও অবিচারের বিষয়গুলো নতুনভাবে দেখেছেন তিনি।
অয়ন মল্লিক বলেন, ‘এখানে এসে দেখলাম, পুরো আয়োজনটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে চলমান বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। নারীদের প্রতি যে অন্যায়-অত্যাচার হচ্ছে, তা এখানে তুলে ধরা হয়েছে। এ জন্য পূজা কমিটিকে ধন্যবাদ জানাই।’
তিনি আরও বলেন, দেবী দুর্গাকে বিচারকের আসনে রেখে বিভিন্ন দৃশ্যের মাধ্যমে নারীর চলার পথে সামাজিক বাধা, নিপীড়ন ও আত্মরক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। এ আয়োজন মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা তাঁর।
আয়োজকদের মতে, ধর্মীয় উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি সামাজিক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই ‘মাতৃ আদালত’-এর মূল উদ্দেশ্য। নারীর প্রতি নির্যাতন বন্ধ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা শুধু নারীদের একার দায়িত্ব নয়; এ ক্ষেত্রে পুরো সমাজের ভূমিকা রয়েছে। অন্যায় দেখেও নীরব না থাকা, নির্যাতনের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার বার্তাই দিতে চান তাঁরা।
আয়োজকেরা জানান, পঞ্চমী থেকেই দর্শনার্থীদের জন্য মন্দিরের মণ্ডপ উন্মুক্ত রাখা হচ্ছে। ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের সমাপ্তি ঘটবে। এদিন প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানো হবে।
বোয়ালখালীসহ বিভিন্ন এলাকার দর্শনার্থীরা এ মণ্ডপ দেখতে এসে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি নারীর প্রতি সম্মান, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও ন্যায়বিচারের বার্তা উপলব্ধি করবেন বলে আশা করছেন আয়োজকেরা।