জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী বলেছেন, একটি নতুন বাংলাদেশ গঠনের জন্য জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। জনগণের দুঃখ-দুর্দশা দূর করে নতুন বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে তারা কাজ করছেন। ঢাকাকে নতুন করে গড়ে তুলতে শাহবাগ থেকে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভ আগামীতে দেশের প্রতিটি শহর ও অলিগলিতে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে চার দফা দাবিতে আয়োজিত গণবিক্ষোভ সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, আপনাদের অনেক কষ্ট রয়েছে। আপনাদের বাসায় গ্যাস নাই, ইলেকট্রিক চুলা দিয়ে রান্না করতে হচ্ছে। আবার যারা এলপিজি গ্যাস কিনতে যাচ্ছেন, সেই এলপিজি গ্যাসের সরকারি ১ হাজার ৮৩৭ টাকা মূল্য আপনাদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ টাকা বা ক্ষেত্রবিশেষে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। চকবাজারে গিয়ে দেখেছি, মানুষ লাকড়ি দিয়ে রান্না করতে হচ্ছে।’
ঢাকার বিভিন্ন এলাকার সমস্যার কথা তুলে ধরে এনসিপির এই নেতা বলেন, আমরা মুগদায় গিয়ে দেখেছি, মুগদা হাসপাতালে সিন্ডিকেট এবং টেন্ডারবাজি কীভাবে মুগদাবাসীকে অতিষ্ঠ করে রেখেছে। আমরা উত্তরা ও মিরপুরে গিয়েছিলাম। মিরপুরে কীভাবে রাড্ডার হাসপাতাল রাতে ভাঙচুর করে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল, তা দেখেছি। যাত্রাবাড়ীতে গিয়ে দেখেছি, কীভাবে দিনে দুপুরে ছিনতাই করে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা ঢাকা শহরের অলিগলিতে ঘুরে দেখেছি ময়লার ভাগাড়, তীব্র যানজট, নর্দমার পানি ও অটোরিকশার সমাহার। প্রত্যেকটি জায়গায় জনগণের যে শান্তির বাংলাদেশ আমরা চেয়েছিলাম, সেই শান্তি আজ বিপর্যস্ত। সেই দুঃখ ও ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে আজকে আমরা শাহবাগে উপস্থিত হয়েছি।
নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, আজকে আমরা ঢাকায় গণবিক্ষোভ মিছিল করছি। আগামীতে আমাদের এই গণবিক্ষোভ মিছিল প্রত্যেকটি শহরে শহরে, অলিগলিতে প্রকম্পিত হবে। কারণ আমরা শপথ নিয়েছিলাম, জুলাইয়ে যে বাংলাদেশ নতুন করে গঠন করব, সেই বাংলাদেশ আমরা গড়ব। আমাদের যে ভাইদের খুনি হাসিনা হত্যা করেছিল, সেই হত্যার বিচার নিশ্চিত করব। আমাদের ওসমান হাদি ভাইকে যারা হত্যা করেছিল, সেই উসমান হাদি ভাইয়ের খুনের বিচার বাংলাদেশে নিশ্চিত করব।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, অসংখ্য রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশে যে সংস্কার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি আমরা নিয়েছিলাম, সেখান থেকে আমরা একচুলও নড়ব না। বরঞ্চ আরও দ্বিগুণ গতিতে আমরা আগুয়ান হয়ে বাংলাদেশের সেই শহীদদের রক্তের প্রতিশ্রুতি, জুলাই সনদ বাংলাদেশে ইনশাআল্লাহ বাস্তবায়ন করব।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে এনসিপির এই নেতা বলেন, আমরা একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলাম। ১২ ফেব্রুয়ারি আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলাম। আগামীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আসছে। সেখানেও আমরা এককভাবে অংশগ্রহণ করব। ইতোমধ্যে অনেকগুলো সিটি করপোরেশনে আমাদের মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণেও ঘোষণা করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আপনারা যারা কাউন্সিলর হতে চান, বিভিন্ন জায়গায় ইউনিয়ন মেম্বার হতে চান, যারা উপজেলা চেয়ারম্যান হতে চান, পৌরসভার মেম্বার হতে চান, আপনাদের এই দলে স্বাগত। কারণ এই দলের চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, দখলদারত্ব ও মাদকের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নাই। এই দলে তারা আছেন, যারা উসমান হাদির আজাদি সংগ্রামে বিশ্বাসী। তারা জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০ শহীদের রক্তের ওপর বিশ্বাসী। এই রক্তের ওপর বিশ্বাস করে ইনশাআল্লাহ আমরা নতুন বাংলাদেশ গঠনে এগিয়ে যাব।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, আমরা গত এক সপ্তাহ যাবত মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা ডেটা সার্ভে করেছি। দক্ষিণ এশিয়ায় নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ভারত প্রত্যেকটি রাষ্ট্রের দ্রব্যমূল্যের দামের তুলনায় বাংলাদেশের দ্রব্যমূল্য ২০ শতাংশ হলেও বেশি। বাংলাদেশের বিভিন্ন পোর্ট এবং চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে যেসব পণ্য ঢোকে, সেখানে একটি সিন্ডিকেট বসানো হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, বাংলাদেশে বড় দুটি সিন্ডিকেটের নাম মেঘনা গ্রুপ আরেকটি বসুন্ধরা গ্রুপ। এই মেঘনা গ্রুপ গত মার্চ মাস থেকে বিএনপির যে নব্য জমিদারি, তারা গুলশান অফিসে কারখানা খুলেছে, সেখানে ৫ মিলিয়ন ডলার করে দিচ্ছে। এবং বসুন্ধরা গ্রুপ গত মাস থেকে বিএনপির সেই গুলশান অফিসে ৫ মিলিয়ন ডলার করে দিচ্ছে। এই সিন্ডিকেটের কারণে আমাদের প্রত্যেকটা মানুষ, যারা খেটে খায়, কুলি-মজুর, কৃষক, প্রত্যেকের আজ ঘরে টান পড়েছে। সরকার আমাদের পেটে লাথি দিয়েছে।
ঢাকার অটোরিকশা বন্ধ ও হকার উচ্ছেদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঢাকাতে দুটি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একটা অটোরিকশা বন্ধ, আরেকটা হকার উচ্ছেদ। আমরা দুটি জনবান্ধব কর্মসূচিকে সমর্থন করি। কিন্তু বাংলাদেশে আপনি অটোরিকশা বন্ধ করছেন, গণপরিবহন আপনি ঢাকাতে ঠিক করছেন না। তাহলে যারা কর্মজীবী মানুষ, যারা বিভিন্ন অফিসে যাচ্ছেন, তারা কীভাবে যাবেন?
তিনি বলেন, আমরা দেখেছি, সরকারি বড় বড় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আজ বাজেট আসে। তাদের জন্য প্রাডো কেনা হচ্ছে, কাল তাদের জন্য লেক্সাস কেনা হচ্ছে, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গাড়ি কেনা হচ্ছে। লুটেরা শ্রেণি আপনার পকেট হাতিয়ে ঢাকাতে বড় বড় গাড়ি হাঁকাচ্ছে। কিন্তু আপনার সন্তান নিয়ে যদি কোনো হাসপাতালে যেতে চান, ঢাকাতে কোনো সুষ্ঠু পরিবহনব্যবস্থা নাই।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, অটোরিকশা যেমন বন্ধ করতে হবে, আপনাদের এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে ঢাকাতে দ্রুতগতিতে গণবান্ধব গণপরিবহনের ব্যবস্থা থাকবে। যদি না দিতে পারেন, তাহলে আপনাদের যে লুটেরা গাড়িগুলো রাস্তায় চলে, সেগুলো আমরা বন্ধ করে দেব। সরকারি অফিসের গাড়ি বন্ধ থাকবে। আগে জনগণের গণপরিবহনব্যবস্থা চলবে, তারপরে অন্যদের ব্যবস্থা হবে।
তিনি আরও বলেন, আপনি টোকিও শহরে গেছেন, লন্ডন শহরে যাচ্ছেন, নিউইয়র্কে যাচ্ছেন, শহর থেকে শহরে, বন্দর থেকে বন্দরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আপনার চোখে কি সেখানে গণপরিবহনের ব্যবস্থা পড়ে না? তাহলে ঢাকায় এই গণপরিবহন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চলছে। এই জন্য আপনি এই লক্কড়-ঝক্কড় বাস আমাদের মাথার ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। আমরা এগুলো মানব না। ঢাকার পরিবহনব্যবস্থা ঠিক করতে হবে।
তরুণদের কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, আমরা অনেক স্বপ্ন দেখেছিলাম যে আমাদের ভাগ্য পরিবর্তন হবে। সেই ভাগ্য পরিবর্তনে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিএনপি। আপনাদের মনে আছে, বিএনপি বলেছিল এক কোটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে। বরঞ্চ তারা গত আট মাসে এক কোটি তরুণের পেটে লাথি মেরেছে।
তিনি বলেন, আমরা সরকারকে বলব, তরুণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন। যদি তরুণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা আপনারা না করতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশে আমরা গিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতৃত্বে সরকার গঠন করব। আমরা তরুণদের দায়িত্ব নিতে বাংলাদেশে প্রস্তুত আছি।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি নিরাপত্তাহীনতা ও তরুণদের ওপর হামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, আমাদের মৃত্যুর মিছিল বড় হচ্ছে। ১ হাজার ৪০০ লোক গেছে। এরপরে শহীদ উসমান হাদি ভাই গিয়েছিলেন। আজকে মনে পড়ে, একজন লোক একা একা হাঁটছিলেন, ইনকিলাব মঞ্চের সেই উসমান হাদি ভাইকে তারা নিয়ে গিয়েছিল। আবার তারা তাশরীফকে নিয়ে গিয়েছে। আমাদের নিরাপত্তা আমাদের গড়ে তুলতে হবে। তারা আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারবে না।
তিনি আরও বলেন, আজকে আমাদের ছাত্রশক্তির একজন সহযোদ্ধা আলিফের চোখ তুলে নেওয়া হয়েছিল। আপনাদের এই প্রোগ্রামে আলিফ এসেছে, যার একটি চোখ নাই। শুধুমাত্র একটি চোখে সে দেখতে পারে। এই আলিফ আজকে তারেক রহমানের সন্ত্রাসের সাক্ষী। আমরা আপনাদের বলব, আপনি বলেছেন চাকরি দেবেন না হলে আমাদের চোখটা আপনি কেড়ে নিচ্ছেন কেন?
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তরুণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন, আওয়ামী লীগের বিচার করেন, জুলাই সংস্কার বাস্তবায়ন করেন, ঢাকা শহরে সুন্দরভাবে গণপরিবহনের ব্যবস্থা কায়েম করেন এবং বাংলাদেশে যে সিন্ডিকেট রয়েছে, মেঘনা ও বসুন্ধরাসহ বড় বড় গ্রুপ যারা কয়েকটি মাফিয়া গোষ্ঠী তৈরি করে আমাদের পেটে লাথি মারার চেষ্টা করছে, এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন।’
তিনি বলেন, যদি দিতে না পারেন, তাহলে গুলশানের যে সিন্ডিকেটের অফিস আছে, সেই সিন্ডিকেটের অফিসের দিকে আমরা যাব। আপনারা সবাই প্রস্তুত আছেন? মিছিল আরও বড় হবে। নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে যেভাবে গণ–অভ্যুত্থান হয়েছিল, আমরা এখনো চুপ করে আছি। আগামীতে নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে ইনশাআল্লাহ আমাদের নেতৃত্বে সরকার গঠন হবে।