
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন থেকে শুরু করে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ওভাল অফিসের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক; সপ্তাহজুড়ে বিশ্বমঞ্চে নিজের প্রভাব পুনর্দখলের চেষ্টা চালাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই কূটনৈতিক ব্যস্ততা ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে আড়াল করতে পারছে না।
ইরান যুদ্ধের বিস্তার, মার্কিন বাজারে পেট্রোলের দাম বৃদ্ধি, জনসমর্থন হ্রাস এবং চীনের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিযোগিতার মুখে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি এখন এক অচলাবস্থার মুখে দাঁড়িয়ে। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ট্রাম্পের এই রাজনৈতিক দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প চুক্তি না করলে ইরানকে ‘ধ্বংস’ করার নতুন হুমকি দেন এবং ভেনেজুয়েলার প্রসঙ্গে জোর খাটিয়ে বলেন, ‘বিজয়ীরা সবকিছুর মালিক হয়।’ কিন্তু এমন আক্রমণাত্মক অবস্থানের বিপরীতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ট্রাম্পকে বেশ নমনীয় ভূমিকায় দেখা গেছে। বিশ্ববাজারে চীনের বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং বিরল খনিজ উপাদানের ওপর বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণের কারণে ট্রাম্প নিজের কঠোর শুল্ক নীতি থেকে পিছিয়ে এসেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
ওবামা প্রশাসনের সাবেক পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা ব্রেট ব্রুয়েন মন্তব্য করেছেন, ট্রাম্প নিজেকে এমন এক জগতে নিয়ে যেতে চান যেখানে শক্তিই শেষ কথা। কিন্তু শি জিনপিং ও উদীয়মান চীনা শক্তির মুখোমুখি হলে তিনি নড়বড়ে হয়ে পড়েন।
তবে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি থমকে যাওয়ার বিষয়টি সঠিক নয় এবং তার ক্ষুরধার বক্তব্য বিশ্বজুড়ে মার্কিন স্বার্থ রক্ষার বিষয়গুলোকেই তুলে ধরেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ট্রাম্প যে ইরান যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, সাত মাস পার হলেও তা এখন এক দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতায় রূপ নিয়েছে। এই যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত করেছে এবং ট্রাম্পের নিজের রাজনৈতিক ঘাঁটিতেই এটি গভীর অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ইউরোপীয় ও এশীয় মিত্রদের বড় অংশই ট্রাম্পের সঙ্গে এ যুদ্ধে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
জাতিসংঘে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ইঙ্গিতপূর্ণভাবে বিশ্ব রাজনীতিকে ‘জঙ্গলের আইনে রূপান্তর’ না করার সতর্কবার্তা দিয়েছেন। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ট্রাম্পের সরাসরি নাম না নিয়ে বলেন, ‘আমাদের জলসীমায় বিমানবাহী রণতরির টহল দেওয়ার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন অপরাধ উসকে দেওয়া অস্ত্র ও অর্থের প্রবাহ বন্ধে সহযোগিতা।’
অন্যদিকে ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে সীমিত যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে ট্রাম্পের চাপ ব্যর্থ হয়েছে। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে ডেনমার্কের সঙ্গে চুক্তি করলেও অঞ্চলটি সম্পূর্ণ ‘নিজের দখলে’ নেওয়ার ট্রাম্পের প্রাথমিক হুমকি বাস্তবে রূপ নেয়নি।
চীনের ‘পান্ডা’ কূটনীতি কি?চীনের ‘পান্ডা’ কূটনীতি কি?
ইউরেশিয়া গ্রুপের প্রধান ইয়ান ব্রেমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, এক বছর আগে খুব কম দেশই ট্রাম্পের মুখোমুখি হওয়ার সাহস পেত। এখন কানাডা, ইউরোপ, চীন, ইরান, রাশিয়া সবাই প্রকাশ্যে ‘না’ বলতে প্রস্তুত।
কূটনৈতিক ক্ষমতার এই টানাটানির মধ্যে খোদ ট্রাম্পকেও কিছুটা সংশয়ে পড়তে দেখা যায়। জাতিসংঘে এআই-কে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ হিসেবে অভিহিত করার প্রস্তাব দিয়ে তিনি বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে বলেন, দেখা যাক আমার কোনও ক্ষমতা আছে কি না। হয়তো আছে, হয়তো নেই। আমরা খুব শিগগিরই তা জানতে পারব।