
রাঙ্গামাটির কাপ্তাই লেকে পানিতে নেমে দুই যুবকের মৃত্যু মনকে নাড়া দিল। সাঁতার জানা এবং না জানা নিয়ে আমরা খুব বেশি ভাবি না। কিন্তু প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায় সাঁতার না জানার কারণে। আর এ-সংক্রান্ত খবর তেমন প্রকাশও পায় না। মফস্বলের গ্রামে জন্ম আমার। পানির সঙ্গে ছোটবেলায় সখ্য ছিল বেশ। দিনের বড় একটা সময় কাটত পানিতে। এ নিয়ে মা শাস্তিও দিয়েছেন অনেক। অবশ্য মা স্বস্তিতে থাকতেন। কারণ, সাঁতারটা জানতাম। তাই পানিতে ডুবে মৃত্যুর ভয় কম ছিল। এখন আমার ১৮ বছরের এক ছেলে ও ১৩ বছরের এক মেয়ে আছে। তারা দু’জনই সাঁতার জানে। তারা যখন পুকুর বা বিলের ধারে যায়, তখন চরম উৎকণ্ঠায় থাকিনা। কিন্তু অনেক অভিভাবকের মধ্যে একই ধরনের উদ্বেগ কাজ করে।
এটি বিশেষ করে শিশুদের জন্য একটি নীরব মহামারি। বাংলাদেশে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তি পানিতে ডুবে প্রাণ হারান। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে এই মর্মান্তিক মৃত্যুগুলো অনেকাংশেই এড়ানো সম্ভব। পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে কার্যকর কিছু পদক্ষেপ নিচে দেওয়া হলো:
সার্বক্ষণিক নজরদারিঃ
পুকুর, ডোবা বা যেকোনো উন্মুক্ত জলাশয়ের আশেপাশে শিশুদের যাওয়ার ব্যাপারে সবসময় সতর্ক থাকুন। কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির তত্ত্বাবধান ছাড়া শিশুদের জলাশয়ের কাছাকাছি একা ছাড়বেন না।
জলাশয় নিরাপদ রাখাঃ
বাড়ির কাছাকাছি থাকা পুকুর বা ডোবার চারপাশে বেড়া বা নিরাপত্তা প্রাচীর নির্মাণ করুন। ব্যবহারের পর বাড়ির ছোট চৌবাচ্চা বা বালতি সবসময় খালি করে বা ঢেকে রাখুন।
সাঁতার শেখানো এবং সচেতনতাঃ
বয়স্ক ও শিশুদের জন্য সাঁতার শেখার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। সাঁতার জানা থাকলে অনেক সময় জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়। স্কুল ও পরিবারের পক্ষ থেকে শিশুদের জলাশয়ের বিপদ সম্পর্কে ধারণা দিন এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করুন।
পানিতে পড়ার প্রাথমিক চিকিৎসাঃ
কোনো ব্যক্তি পানিতে ডুবে গেলে তাকে দ্রুত উদ্ধার করে সমতল স্থানে শুইয়ে দিন। শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ থাকলে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী তাৎক্ষণিক সিপিআর (CPR) দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। বিলম্ব না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতাল বা চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন।
শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে পরিবারের পাশাপাশি সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মূলত পরিবারের সদস্যদের অসচেতনতা ও যথাযথ নজরদারি না থাকার কারণে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। অধিকাংশ শিশু পরিবারের সদস্যদের অগোচরে বাড়ি-সংলগ্ন পুকুর বা জলাশয়ে চলে যায় এবং দুর্ঘটনার শিকার হয়। শিশুদের যথাযথ পর্যবেক্ষণে রাখা গেলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো সম্ভব।
আবার নৌপথে দুর্ঘটনায়ও অনেকের মৃত্যু হয় পানিতে ডুবে। এসব ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি কমাতে হলে সাঁতার শেখার বিকল্প নেই। এ জন্য প্রত্যেক শিশুকে সাঁতার শেখানো জরুরি।
বড়দের পানিতে ডুবে মৃত্যু সাধারণত সাঁতার না জানা, হঠাৎ স্রোতে ভেসে যাওয়া, খিঁচুনি বা স্ট্রোক, মাছ ধরতে গিয়ে জালে জড়িয়ে পড়া, গভীর জলাশয়ে নৌকা উল্টে যাওয়া বা উদ্ধার অভিযানে নেমে ঘটে থাকে। নদী, পুকুর বা হ্রদের মতো গভীর পানিতে সাঁতার জানা থাকলেও আতঙ্ক বা শারীরিক অসুস্থতার কারণে বড়দের মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। বড়দের জন্য করনীয়
সাঁতার শেখাঃ নিজে সাঁতার জানা না থাকলে যেকোনো বয়সেই তা শেখা উচিত।
জলে নামার সতর্কতাঃ সাঁতার জানা থাকলেও অপরিচিত বা খরস্রোতা নদী, হ্রদ বা গভীর জলাশয়ে একা বা রাতে গোসল করা থেকে বিরত থাকুন।
সেফটি গিয়ার ব্যবহারঃ নৌকা বা ট্রলারে ভ্রমণ করার সময় সবসময় লাইফ জ্যাকেট বা পর্যাপ্ত ভাসমান উপকরণ সাথে রাখুন।
ধৈর্য ও সাহসঃ পানিতে কেউ ডুবে গেলে তাকে উদ্ধারের সময় নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দড়ি, বাঁশ বা কলাগাছের মতো বস্তু ব্যবহার করা উচিত।
যাই হোক, পানিতে ডুবে অকাল মৃত্যু কারও কাম্য নয়। বর্তমান সরকার পানিতে ডুবে মৃত্যুরোধে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে কেবল সরকারি উদ্যোগে পানিতে ডুবে মৃত্যুরোধ সম্ভব নয়। পারিবারিক, সামাজিক ও ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা ছাড়া এ মৃত্যু রোধ করা সম্ভব নয়। প্রত্যেক শিশুই যেহেতু দেশের সম্পদ ও ভবিষ্যৎ, সেহেতু পানিতে ডুবে তাদের অকাল মৃত্যু রোধে অধিকতর জনসচেতনতার বিকল্প নেই। তাই সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে ব্যক্তি পর্যায়ে শিশুদের নিরাপদে রাখতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি সবাই মিলে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে, যাতে শিশুরা নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারে।
লেখকঃ সম্পাদক