
শনিবার ইয়েমেন উপকূলের কাছে সোমালি জলদস্যুরা একটি তেলবাহী জাহাজ ছিনতাই করেছে। পরে জাহাজটি সোমালিয়ার জলসীমায় নিয়ে যাওয়া হয়। রোববার সোমালিয়ার কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানায়। সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে এটি তৃতীয় ছিনতাইয়ের ঘটনা।
ছিনতাই হওয়া জাহাজটির নাম ‘ইউরেকা’। এটি টোগোর পতাকাবাহী। ইয়েমেনের কোস্ট গার্ড জানায়, শনিবার কিছু অজ্ঞাত ব্যক্তি জাহাজে উঠে পড়ে এবং সেটিকে নিয়ন্ত্রণে নেয়। এরপর জাহাজটি এডেন উপসাগরের ইয়েমেন অংশ দিয়ে সোমালিয়ার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
জাহাজটিকে খুঁজে বের করা ও উদ্ধার করার চেষ্টা চলছে- জানায় হিরান অনলাইন।
সোমালিয়ার গালমুদুগ রাজ্যের বন্দর মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক আবশির হাশি আলি বলেন, পুন্তল্যান্ড উপকূলের কাছে জাহাজটি মুক্তিপণের জন্য আটকে রাখা হয়েছে।
এই ঘটনা সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, দেশটিতে আবার জলদস্যুতা বাড়ছে।
একই সময়ে লোহিত সাগর এখন বিশ্ববাণিজ্যের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ ইরানসংক্রান্ত জটিলতায় হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রয়েছে।
ইয়েমেনের কাছে এই ছিনতাইয়ের ঘটনায় নতুন করে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সোমালি জলদস্যুদের সঙ্গে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের কোনো যোগাযোগ থাকতে পারে। আঞ্চলিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-বাসা বলেন, দুই দেশের কর্তৃপক্ষ তাকে এমন তথ্য দিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুন্তল্যান্ডের এক কর্মকর্তা জানান, এই হামলায় কিছু ইয়েমেনির জড়িত থাকার সন্দেহ রয়েছে। তাদের সঙ্গে হুতি বা অন্য কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্পর্ক আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে সরকার।
বিশ্লেষকদের মতে, হুতি বিদ্রোহী ও সোমালি জলদস্যুদের মধ্যে আগে থেকেই যোগাযোগ রয়েছে। কখনো কখনো বিদ্রোহীরা প্রযুক্তি ও সামরিক সহায়তা দেয়। বর্তমানে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এতে অবৈধভাবে লাভের সুযোগ বেড়ে যাওয়ায় তাদের আরো বেশি একসঙ্গে কাজ করার সম্ভবনা তৈরি হয়েছে।
পুন্তল্যান্ডের বন্দর বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, জলদস্যু ও হুতিদের মধ্যকার সংযোগ অস্বাভাবিক নয়।
গত কয়েক দশক ধরে লোহিত সাগর এলাকায় সোমালি জলদস্যুতা বড় সমস্যা ছিল। ২০১০ সালের দিকে এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। তখন শত শত জাহাজ ছিনতাই হয় এবং শিপিং কোম্পানি ও বিমা খাতে বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়, যার বড় অংশই ছিল মুক্তিপণ।
পরে আন্তর্জাতিক নৌ জোট গঠনের ফলে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এতে অংশ নেয়। জাহাজগুলো সোমালিয়া উপকূল থেকে দূরে চলাচল শুরু করে এবং জলদস্যু ঠেকাতে বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য নতুন হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। গাজায় সংঘাতের সময় তারা এসব হামলা চালায়। তবে গত বছরের শেষ দিকে যুদ্ধবিরতির পর সেই হামলা কমে আসে।
সোমালিয়ার বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাই জলদস্যুতা বাড়ার বড় কারণ। উপকূলীয় দরিদ্র এলাকায় সশস্ত্র দলগুলো আবার ছোট ছোট নৌকা নিয়ে সমুদ্রে নামছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, বিদেশি বড় ট্রলার জাহাজ আসায় মাছ ধরা কম লাভজনক হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ওই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক নজরদারি কমে গেছে বলে জানিয়েছেন সোমালি নিরাপত্তা বিশ্লেষক সামিরা গেইদ।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি জলদস্যুদের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে। মুক্তিপণের মাধ্যমে তারা কয়েক কোটি ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে অবৈধ হলেও কিছু ক্ষেত্রে তারা স্থানীয় সমর্থন পায়।
সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহাম্মদের জন্য এই পরিস্থিতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার দেশের সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী করতে চাইছে, কিন্তু জলদস্যুতা ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর কারণে তা কঠিন হয়ে পড়ছে। তুরস্কের সহায়তা থাকলেও দেশটি এখনো পুরো জলসীমা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না।
একই সময়ে সরকার আল-শাবাব জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও লড়াই চালাচ্ছে। তবে বিশ্লেষক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক জাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনায় এ গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত সোমালি জলদস্যুরা অন্তত তিনটি জাহাজ ছিনতাই করেছে। ব্রিটিশ নৌবাহিনী পরিচালিত ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস ওই এলাকায় ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়েছে এবং জাহাজগুলোকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
সামুদ্রিক তথ্যভাণ্ডার ভেসেলফাইন্ডারের তথ্য অনুযায়ী, ‘ইউরেকা’ সর্বশেষ সংযুক্ত আরব আমিরাতে নোঙর করেছিল। পরে ইয়েমেন উপকূলের কাছে গিয়ে এটি হঠাৎ সোমালিয়ার দিকে ঘুরে যায়। সর্বশেষ জাহাজটিকে দুই দেশের মাঝামাঝি এলাকায় দেখা গেছে।
জাহাজটির বর্তমান অবস্থান ও নাবিকদের অবস্থা এখনো নিশ্চিত নয়। জনসাধারণের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটির মালিক রয়্যাল শিপিং লাইনস ইনকরপোরেটেড। তবে প্রতিষ্ঠানটি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।