
বোয়ালখালী প্রতিনিধি:
ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন পূরণে আর মাত্র তিন মাস বাকি ছিল। এরপরই ইন্টার্নশিপে যোগ দিয়ে চাকরিজীবনের পথে হাঁটার কথা ছিল ওমর বিন নুরুল আবছারের। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর উত্তরার জসিমউদ্দীন সড়কে গুলিবিদ্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। এক বছর পেরিয়ে গেলেও ঘটনার বিচার ও তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে কিছু জানে না পরিবার।
চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া ইউনিয়নের আকুবদণ্ডী গ্রামের বাসিন্দা ওমর বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ট্রেনিং সেন্টারে (বিএটিসি) ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে অধ্যয়নরত ছিলেন। পরিবারের আশা ছিল, পড়াশোনা শেষ করে চাকরিতে যোগ দিয়ে সংসারের দায়িত্ব নেবেন তিনি।
পরিবার জানায়, ৫ আগস্ট সরকার পতনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর উত্তরার বিজয় মিছিলে যোগ দেন ওমর। মিছিলে যাওয়ার আগে নিজের ফেসবুক আইডিতে এক শব্দের একটি স্ট্যাটাস দেন—‘স্বাধীন’। পরে দুপুরে মাকে ফোন করে বলেন, ‘আম্মু, নিউজ পাইছো? শেখ হাসিনা পদত্যাগ করছে। আমি এখন বিজয় মিছিলে। সবাই মিষ্টি খাচ্ছে।’ সেটিই ছিল তাঁর মায়ের সঙ্গে শেষ কথা।
ওমরের মা রুবি আক্তার বলেন, আগের রাতে ছেলে মোবাইলে ব্যালেন্স দিতে বলেছিলেন। তিনি ভুলে যাওয়ায় সকালে অভিমান করে ওমর বলেছিলেন, ‘আম্মু, টাকা দাও নাই, তাই কল দিতে পারতেছিলাম না।’ পরে ব্যালেন্স পাঠানোর পর দুপুরে তাঁদের শেষবারের মতো কথা হয়।
দুপুরে টেলিভিশনে উত্তরার পরিস্থিতির খবর দেখে পরিবারের সদস্যরা ওমরকে ফোন দেন। ফোন ধরেন অপরিচিত একজন। তিনি জানান, ওমরের পায়ে গুলি লেগেছে এবং তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। পরে বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে ঢাকায় থাকা এক স্বজনের মাধ্যমে একটি হাসপাতাল থেকে ওমরের মরদেহের ছবি পান পরিবারের সদস্যরা।
পরিবারের ভাষ্য, বিকেল পৌনে চারটার দিকে উত্তরার জসিমউদ্দীন সড়কে গুলিবিদ্ধ হন ওমর। তাঁকে ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হলে সন্ধ্যা ছয়টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
ওমরের বাবা নুরুল আবছার তখন সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে দেশে ফিরে আসেন। ৭ আগস্ট বোয়ালখালীর পারিবারিক কবরস্থানে ওমরকে দাফন করা হয়।
ছয় ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন ওমর। বড় ভাই শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় পরিবারের ভবিষ্যতের বড় দায়িত্ব তাঁর ওপরই ছিল বলে জানান স্বজনেরা।
ঘটনার প্রায় ১০ মাস ২০ দিন পর, ২০২৫ সালের ২৫ জুন আদালতের নির্দেশে তদন্তের প্রয়োজনে ওমরের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করা হয়। সুরতহাল প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্ত শেষে একই দিন রাতে তাঁকে পুনরায় দাফন করা হয়। তবে এক বছর পেরিয়ে গেলেও তদন্ত বা ময়নাতদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে পরিবারকে কিছু জানানো হয়নি বলে অভিযোগ তাঁদের।
রুবি আক্তার বলেন, ‘আমাদের একটাই চাওয়া—আমার ছেলের মৃত্যুর সঠিক বিচার হোক। যে স্বপ্ন নিয়ে আমাদের সন্তানরা জীবন দিয়েছে, সেই বাংলাদেশ যেন ন্যায়বিচারের বাংলাদেশ হয়।’
আজও আকুবদণ্ডীর বাড়িতে ওমরের বই, পোশাক ও ব্যবহার করা জিনিসপত্র আগের মতোই সাজানো আছে। শুধু নেই সেই তরুণ, যিনি মাকে কথা দিয়েছিলেন, ‘ইঞ্জিনিয়ার হয়ে চাকরিতে ঢুকে যাব।’